নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগ নির্নয় ও জটিল অপারেশনের জন্য কোটি কোটি টাকায় কেনা ভারী যন্ত্রপাতিগুলো কৃত্রিমভাবে অচল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা যন্ত্রপাতির উপর ভর করে বেসরকারী ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো দিন দিন ফুলে ফেঁপে উঠলেও দক্ষিনাঞ্চলের উন্নত চিকিৎসার ভরসাস্থল শের-ই বাংলা মেডিকেলের ভারী যন্ত্রপাতিগুলো বিকল হচ্ছে রহস্যজনকভাবে। শের-ই বাংলা মেডিকেলের টেকনোলজিস্টদের অনেকে নগরীর বিভিন্ন বেসরকারী ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসায়ীক অংশিদার এবং অর্থের বিনিময়ে অনেকের যোগসাজস রয়েছে তাদের সাথে। এ কারনে সচল যন্ত্রপাতি অচল করে মেডিকেলের রোগীদের বাইরে যেতে বাধ্য করছে তারা।

মুর্মূর্ষ রোগীর জীবন রক্ষায় ৩ বছর আগে এই হাসপাতালে স্থাপিত ১০ শয্যার আইসিইউ বেড ব্যবহার না করতে করতে বিকল হয়ে যায়। বেডগুলো অচল থাকায় অনেক মুর্মূর্ষ রোগী মারা যায়। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে ওই ১০টি আইসিইউ বেড মেরামত করে সচল করা সহ এবং করোনা ওয়ার্ডে ১৮টি নতুন আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়। তবে আইসিইউ ইউনিটের জন্য এখনও পদায়ন করা হয়নি কোন চিকিৎসক। অন্য বিভাগের চিকিৎসক দিয়ে কোনমতে চালু রাখা হচ্ছে আইসিইউ সেবা।

রোগীদের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ন আল্ট্রাসনোগ্রাম হয় না গত এক বছর ধরে। দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনের দুটিই বিকল থাকায় সেবা বঞ্চিত রোগীরা।

মস্তিস্কে হাড়ে কিংবা শরীরের মধ্যের জটিল রোগ নির্নয়ের জন্য কোটি কোটি টাকায় কেনা এমআরআই মেশিন দুই বছর ধরে বিকল। এ কারনে গুরুত্বপূর্ন এই পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

ক্যান্সারের রোগীর রেডিয়েশন দেয়ার জন্য খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের একমাত্র কোবাল্ট-৬০ রয়েছে শের-ই বাংলা মেডিকেলে। অথচ গত ২ বছর বছর ধরে এই মেশিনটি বিকল অবস্থায় রয়েছে।

অত্যাধুনিক ২টি সিটি স্ক্যান মেশিনের একটি ১ বছর ধরে এবং অপরটি গত ৮ মাস ধরে বিকল। এ কারনে হাসপাতালে আগত মস্তিস্কে আঘাত সহ জটিল রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে সিটি স্ক্যান করতে হয় বাইরের বিভিন্ন সিটি স্ক্যান সেন্টারে।

এই হাসপাতালের ৬টি এক্স-রে মেশিনের ৪টি-ই অচল দির্ঘদিন ধরে। আধুনিক এই ডিজিটাল মেশিন দিয়ে এক্স-রে করলে আল্ট্রাসনোগ্রামও প্রয়োজন হয় না দাবী বিশেষজ্ঞদের। গুরুত্বপূর্ন কিডনী ও লিভার এক্স-রে করার ব্যবস্থা থাকলেও টেকনিশিয়ানের সংকট দেখিয়ে এই এক্স-রে বন্ধ রয়েছে। ৬টি এক্স-রে মেশিনের ৪টি অচল থাকায় ২টি মেশিন দিয়ে এক্স-রে করাতে রোগীদের দির্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। হয়রানী আর টেকনোলজিস্টদের রুক্ষ ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে সেবা প্রত্যাশীরা চলে যান বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

হাসপাতালের প্যাথলজিতে হরমোন, এলার্জি ও যৌন রোগের পরীক্ষা হয় না রি-এজেন্ট সংকটের অজুহাতে। অথচ দির্ঘদিন ধরে রি-এজেন্ট সংগ্রহের উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের। প্যাথলজিতে রয়েছে জনবল সংকটও।

১০ বছরেরও বেশী সময় ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে থাকার পর ২ বছর আগে হৃদরোগীদের সেবায় চালু হয় এনজিওগ্রাম মেশিন। দির্ঘ দেড় বছরে কয়েক শ’ রোগীর এনজিওগ্রাম হয় স্বল্প টাকা খরচে। অথচ গত ৬ মাসেরও বেশী সময় ধরে এনজিওগ্রাম মেশিনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতালের ইটিটি মেশিনটিও বিকল হয়ে পড়ে আছে গত ১ বছর ধরে। এই মেশিনটি চালু এনজিওগ্রাম করার তেমন প্রয়োজন হতো না হৃদ রোগীদের।

চক্ষু রোগীদের সেবায় ৫ বছর আগে ১২ কোটি টাকায় কেনা লেসিক মেশিনটি গত ১ বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। অথচ লেসিক করালে চশমা ব্যবহারের তেমন প্রয়োজন হতো না চক্ষু সমস্যাগ্রস্থ রোগীদের। চোখের ছানি অপারেশনের ফেকো মেশিনও বিকল গত ৪ বছর ধরে।

দেশের সবগুলো হাসপাতালে ২৪ ঘন্টা রোগ পরীক্ষার-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও একমাত্র শের-ই বাংলা মেডিকেলে জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। এ কারনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করাতে পেরে প্রতিদিন বাইরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিতে ভীর করছেন হাসপাতালের রোগীরা।

অভিযোগ রয়েছে শের-ই বাংলা মেডিকেলের সামনে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ডায়গনস্টিক ও প্যাথলজির ব্যবসায়ীক অংশিদার হাসপাতালের টেকনলজিস্টরা। হাসপাতালের অনেক ডাক্তার-কর্মচারীদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে তাদের সাথে। সিন্ডিকেট করে হাসপাতালের ভারী আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো কৃত্রিমভাবে অচল করে রোগীদের বাইরে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। বাইরে রোগ পরীক্ষার নির্দিস্ট কমিশন পৌঁছে যায় হাসপাতালের ডাক্তার ও আয়াদের কাছে।

শের-ই বাংলা মেডিকেলের সামনে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, হাসপাতালের যে কোন রোগীকে ডায়াগনস্টিকে নিয়ে গেলে পরীক্ষা ফি’র ৩০ ভাগ আয়া-বুয়া এবং ৩০ ভাগ সংশ্লিস্ট চিকিৎসককে কমিশন দিতে হয়।

শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন হাসপাতালের ভারী যন্ত্রপাতিগুলো বিকল থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, কোটি কোটি টাকায় ভারী ভারী মেশিন কেনা হয়। এতে এক শ্রেনীর মানুষের ব্যবসা হয়। অথচ এগুলো চালানোর জন্য কোন দক্ষ ও যোগ্য জনবল নেই হাসপাতালে। এসব আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য হাসপাতালে অন্তত ২জন বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী প্রয়োজন। কিন্তু শের-ই বাংলা মেডিকেলে বায়োমেডিকেল প্রকৌশলীর পদ-ই সৃস্টি হয়নি আজ পর্যন্ত। ৬৮ সালের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ২২৪জন ডাক্তারের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ৯৬জন। প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্টও নেই। তাহলে কিভাবে সব কিছু ঠিকঠাক থাকবে- প্রশ্ন রাখেন পরিচালক।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে